বিষাক্ত নীল পদ্ম উপন্যাস পর্বঃ ৬ মরীচিকার পেছনে

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0


শহরের এক কোণে পুরনো একটি লাইব্রেরি। ধুলোমাখা বইয়ের তাক, হলদেটে হয়ে যাওয়া পাতা আর কাঠের আসবাবপত্রের ঘ্রাণে চারপাশটা এক অন্যরকম গাম্ভীর্যে ভরা। সাফওয়ান এখানে এসেছে একটু নির্জনতার খোঁজে। কিন্তু আসলে সে কি নির্জনতা খুঁজছে, নাকি নিজের কাছ থেকে পালানোর পথ খুঁজছে? তার মানসিক অবস্থা এখন সেই পথিকের মতো, যে মরুভূমির তপ্ত বালুতে পিপাসায় কাতর হয়ে দূরের মরীচিকাকে জল ভেবে ভুল করে। সে জানে ওটা জল নয়, তবুও তার পা দুটো তাকে ওদিকেই টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

স্মৃতির দহন ও মানসিক বিভ্রম
সাফওয়ান একটি পুরনো কাঠের চেয়ারে বসে আছে। তার সামনে খোলা আছে ইমাম গাজ্জালির একটি কিতাব, কিন্তু তার মন পড়ে আছে সাহেলার সাথে কাটানো গত বিকেলের মুহূর্তগুলোতে। সাফওয়ানের মনে হচ্ছে, সে এক সমান্তরাল জীবনে বাস করছে। এক জীবনে সে মানুষের শ্রদ্ধেয় 'সাফওয়ান ভাই', আর অন্য জীবনে সে এক ছায়ামানব—যে কি না নিজের স্ত্রী মরিয়মকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি তিল তিল করে ভেঙে ফেলছে।

সাফওয়ানের মনে পড়ল ইয়াসমিন মুজাহিদের সেই কথা—"মানুষ যখন আল্লাহর ভালোবাসা বাদ দিয়ে অন্য কিছুতে প্রশান্তি খোঁজে, তখন সেই জিনিসটিই তার যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।" সাফওয়ান তা অনুভব করছে। সাহেলার সাথে কথা বললে মুহূর্তের জন্য তার ভালো লাগে, এক অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করে। কিন্তু কথা শেষ হওয়ার ঠিক পরের মুহূর্তেই এক বিশাল কালো বিষণ্ণতা তাকে গ্রাস করে নেয়। এক আত্নপীড়ন আত্নদহনে রূপ নেয়। এই আনন্দটা অনেকটা তামাকের ধোঁয়ার মতো—একবার টানে শান্তি দেয়, কিন্তু ভেতরটা ফুসফুসটা সে পোকায় কাওয়ার মতো কুরে কুরে খায়।

লাইব্রেরির গুমোট পরিবেশ ও বিবেকের কাঠগড়া
লাইব্রেরির ভেতরটা আজ বড়ই নিঝুম। ওপরের সিলিং ফ্যানটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে ঘুরছে, যেন সাফওয়ানের বিবেকের ওপর কোনো এক অচেনা কাঠ মিস্ত্রি করাত চালাচ্ছে। জানালার ফাঁক দিয়ে রোদের তেরছা আলো ধুলিকণাগুলোকে স্পষ্ট করে তুলছে। সাফওয়ান সেই ধুলিকণাগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবছে, তার ইমান কি এখন এই ধুলোর মতোই ওড়াওড়ি করছে? যা বাতাসের চেয়েও হালকা!! যার কোনো স্থিরতা নেই, কোনো গভীরতা নেই?

হঠাৎ তার নজরে এল লাইব্রেরির কোণে বসা এক বৃদ্ধের দিকে। সাদা দাড়ি, কপালে সিজদাহর চিহ্ন, একমনে কুরআন তেলাওয়াত করছেন। বৃদ্ধের শান্ত চেহারাটা দেখে সাফওয়ানের নিজের ওপর প্রচণ্ড ঘৃণা হলো। এক সময় সে নিজেও এমন প্রশান্তি অনুভব করত। তার কণ্ঠ দিয়ে যখন নাশিদ বের হতো, তখন তার মনে হতো সে আল্লাহর খুব কাছাকাছি। আজ তার কণ্ঠ আছে, সুর আছে, খ্যাতি আছে—কেবল সেই 'সংযোগ' (Connection) টুকু নেই।

সে নিজেকে প্রশ্ন করল—"আমি কি সত্যিই সাহেলাকে ভালোবাসি? নাকি আমি কেবল নিজের একঘেয়েমি দূর করতে চাইছি? সাহেলা কি আমার আত্মার আত্মীয়, নাকি আমার নফসের একটি ফাঁদ?"

মরীচিকার আকর্ষণ ও পতনের ঢাল
মানুষ যখন কোনো ভুল পথে হাঁটে, তখন সে অবচেতনভাবেই সেই পথকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য কিছু মায়াবী যুক্তি দাঁড় করায়। সাফওয়ানও তাই করছে। সে ভাবছে, মরিয়ম খুব সাধারণ, সে শিল্প বোঝে না, সে সুর বোঝে না। কিন্তু সাহেলা? সে সাফওয়ানের প্রতিটি সুরের গভীরতা বোঝে।

এই যে 'বোঝা'র খেলা—এটিই হচ্ছে মরীচিকা। সাফওয়ান বুঝতে পারছে না যে, মরিয়ম তাকে বোঝে না কারণ মরিয়ম তাকে বিশ্বাস করে। আর সাহেলা তাকে বোঝে কারণ সে নিজেও একই পতনের পথে যাত্রী। মরিয়ম তাকে জান্নাতের দিকে টেনে নিতে চায়, তাই সে মাঝে মাঝে কঠোর হয়। আর সাহেলা তাকে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তাই সে অত্যন্ত কোমল এবং মোহনীয়।

সাফওয়ান তার ডায়েরিতে ছোট করে একটি বাক্য লিখল—"আমি এক অপূর্ব সুবাসের পেছনে ছুটছি, যার শেষটা কেবল পচা দুর্গন্ধ।" লিখে পরক্ষণেই সে ওটা ছিঁড়ে ফেলল। সত্য যখন মানুষের সামনে নগ্ন হয়ে আসে, তখন মানুষ তা সহ্য করতে পারে না।

পরিবেশের রূপক বর্ণনাঃ আগন্তুক ঝড়
লাইব্রেরির বাইরে হঠাৎ আকাশের রঙ বদলে গেল। সাদার বদলে ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেল চারপাশ। বাতাসের বেগ বাড়ছে। লাইব্রেরির পুরনো জানালার পাল্লাগুলো সশব্দে নড়ছে। সাফওয়ানের মনে হলো, এই প্রকৃতি যেন তার ভেতরের ঝড়ের প্রতিফলন।

সে উঠে দাঁড়াল। তাকে বাসায় ফিরতে হবে। কিন্তু বাসায় ফিরলেই তাকে মরিয়মের সেই পবিত্র মুখচ্ছবির মুখোমুখি হতে হবে। মরিয়মের ওই মৌন চাহনি যেন সাফওয়ানকে প্রতিদিন হাজারবার ফাঁসির মঞ্চে দাঁড় করায়। মরিয়ম যখন শান্ত স্বরে বলে, "তুমি কি খেয়েছ?"—তখন সাফওয়ানের মনে হয় মরিয়ম আসলে জিজ্ঞেস করছে, "তুমি কি এখনো মানুষের কাতারে আছো?"

সে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে এল। করিডোরের অন্ধকার তাকে যেন গিলে খেতে চাইছে। সে তার পকেটের মোবাইল ফোনটাকে স্পর্শ করল। সেখানে রাখা ফোনটি এখন তার কাছে একটি জীবন্ত সাপের মতো, যা কি না তাকে মাঝেমধ্যে দংশন করে বিষ ঢেলে দিচ্ছে, আবার মায়ার চাদরে জড়িয়েও রাখছে।

দর্শনের প্রতিফলন
সাফওয়ান যখন তার গাড়িতে গিয়ে বসল, তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে। গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন দিয়ে বাইরের পৃথিবীটা ঝাপসা হয়ে এল। সে ভাবল, মানুষের জীবনটাও তো এমন ঝাপসা। আমরা যাকে আলো ভাবি, তা অনেক সময় অন্ধকার হয়। সাফওয়ান এখন সেই অন্ধকারের যাত্রী, যে মরীচিকার পেছনে ছুটতে ছুটতে নিজের ঘর, নিজের ইমান এবং নিজের অস্তিত্বকে হারিয়ে ফেলছে।

খালিদ হোসাইনি লিখেছিলেন—"এমন অনেক পাপ আছে যা করার সময় মনে হয় আমরা আকাশ ছোঁব, কিন্তু করার পর দেখা যায় আমরা পাতালে তলিয়ে গেছি।" সাফওয়ান এখন সেই পাতালের গভীরতা মাপছে।

সাফওয়ান কি এই মরীচিকার মায়া ত্যাগ করতে পারবে? নাকি পরবর্তী পর্বঃ "খসে পড়া নক্ষত্র"-এ তার এই গোপন জীবন জনসমক্ষে চলে আসার প্রথম ধাপটি রচিত হবে? তা জানতে চোখ রাখুন আমাদের এই সাইটে।
”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default